অটিজম

শিশুর আত্মঘাতী আচরণ বা সেলফ ইনজুরি বন্ধে ৫টি কৌশল

অটিজম শনিবার, ০৪ জুলাই ২০২০ ১০:২০:২৮

বিশেষ ধরণের শিশুদের ক্ষেত্রে দুর্ভাগ্যজনকভাবে আত্মঘাতী আচরণ করা অস্বাভাবিক নয়। এই আচরণগুলি হতে পারে কামড় মারা, আঘাত করা, এমনকি নিজের মাথা দেয়ালে বা আসবাবপত্রে তীব্রভাবে আঘাত করা। পিতামাতা হিসাবে নিজের শিশু এভাবে নিজকে আঘাত করছে দেখাটা খুবই নির্মম অভিজ্ঞতা। অটিজমে আক্রান্ত শিশুদের ক্ষেত্রে এ ধরণের আচরন প্রায়শই দেখা যায়। এই সেলফ ইনজুরির প্রবণতা কমানোর জন্য কিছু কৌশল আমরা আজ এখানে লিখছি। এগুলো দিয়েই যে সে এ ধরণের কাজ হতে নিজেকে নিবৃত্ত করবে, তা কতক ক্ষেত্রে হয়ত হবে না। তবে আপনি এগুলো দেখে আপনার শিশুর ধরণ অনুযায়ী নিজের মতো করেও কিছু পদ্ধতি বের করে নিতে পারবেন, বলে আমরা আশা করছি।

আপনার শিশু এমন আচরণ করে  এবং কিভাবে আপনি থামাতে সাহায্য করতে পারেন, এ মর্মে নিম্নে কিছু পদ্ধতি আলোচনা করা হলো।

১. এদের নিরাপদ রাখুন

প্রাথমিকভাবে আপনার সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ কাজ হচ্ছে তাকে নিরাপদে রাখার সর্বোচ্চ ব্যবস্থা করা। এক্ষেত্রে যদি আপনার সন্তানের দেয়ালে মাথা দিয়ে বাড়ি মারার প্রবনতা থাকে তবে তার উচ্চতা অনুযায়ী দেয়ালে নরম ফোমের প্যাড লাগিয়ে রাখুন। আর যদি তার কামড় দেইয়ার প্রবণতা থাকে, তাহলে তাকে পুরু কাপড়ের ফুলহাতা জামা পরান।
না এটা আপনার সমাধান নয়..... কিন্তু আপনাকে তো শিশুর ব্যাথা পাওয়া বা ক্ষতি হবার মতো পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে।

২. একটা টীম মানে দল বানান
এধরণের বড় আচরণগত সমস্যা একা একা সমাধান করার চেষ্টা করবেন না। বন্ধুবান্ধব, পরিবারপরিজন, থেরাপিস্ট, ডাক্তার সবাইকে নিয়ে একটি দল বানাতে চেষ্টা করুন। আপনার শিশু রোগবিশেষজ্ঞকে সবার আগে রাখবেন। তার সাজেশনগুলো শুনুন। তারপর আপনার শিশুর আচরণ বিবেচনায় ঐ সাজেশনগুলো মাথায় রেখে পদক্ষেপ নিন। তারপর আপনি বিহেভিয়ারিস্ট, পেশাজীবী থেরাপিস্ট, বাসার কেয়ার গিভারের সাথে  এবং তার স্কুলের টিচারের সাথে কথা বলবেন।
সর্বোচ্চ চেষ্টা করুন সাপোর্টিভ মানুষ খুঁজে বের করার জন্য, যারা আপনার শিশুর প্রতি মমতাশীল। আপনার শিশুর জন্য এটাই সবচেয়ে ভাল পদক্ষেপ। কারণ মাঝে মাঝে আপনাকে পেছনে চলে আসতে হতে পারে তখন দলের অন্য কাউকে দায়িত্ব দিবেন।

৩. রেকর্ড রাখুনঃ পূর্ববর্তী ও বর্তমান আচরণ এবং প্রভাবগুলো দেখুন
প্রথমেই আপনাকে নির্ধারণ করতে হবে, শিশুটি এমন করছে কেন? কেন শিশুটি নিজেকে আঘাত করছে? কি কি পরিস্থিতিতে সে এরকম আচরণ করে? এটি হতে পারে, তার চারপাশের উদ্ভুত কিছু পরিস্থিতি বা কোন শব্দ বা কোন আচরণ। এই ট্রিগারিং ফ্যাক্টরগুলো চিহ্নিত করুন। তারপর সেগুলো তে যেন সে না পড়ে, তার জন্য চেস্টা করুন। আমার সন্তানের বেলায় এরকম কয়েকটা শব্দ ছিল, যেগুলো শুনলেই সে রাগ হয়ে যেত। আমরা আমাদের বাসার বাকী সদস্যদের এ ব্যাপারে কয়েকদিন সতর্ক করার পর, তারা কেউ ঐ শব্দ উচ্চারণ করছে না এবং এতে ঐ শব্দগুলো শুনে তার রেগে যাবার ব্যাপারটাও এখন অনেকাংশেই চলে গেছে। কি কি কারনে বা পরিস্থিতিতে শিশুটি এ ধরণের আচরণ করে, তার তালিকা তৈরী করুন। তারপর সেগুলো নিয়ে বিহেভিয়ারিস্টের সাথে কথা বলুন। তারাও আপনাকে এ ক্ষেত্রে কার্যকরী গাইডলাইন দিতে পারবেন।
Applied Behavior Analysis (ABA) এর প্রবক্তারা সুপারিশ করে কিছু রেকর্ড রাখতে যেমন, আগের ইনজুরিগুলো, আগের আচরণগুলো, বর্তমান আচরণ (বিশেষ করে ভায়োলেন্সের মাত্রা – কামড় দেয়া শুধু না, ঐ রকম সময়ে কেমন শক্তি প্রয়োগ করে) এবং আচরণের প্রভাবগুলো। এটা শুধু তার আচরণই নয়, আপনার ঐ সময়ের আচরণগুলোও রেকর্ডে রাখুন। যেমন, কামড় দেয়া শুরু করার আগে আপনি কী করছিলেন? যখন কামড় দিচ্ছিল তখন আপনি কী করছিলেন? তারপরে আপনি কেমন আচরণ করেছিলেন?
আচরণ ডকুমেন্ট করা আপনাকে উন্নতির পথ খুঁজতে সাহায্য করবে, আপনার কোন উদাসীনতা বা অতিরঞ্জন আছে কিনা যা শিশুর আচরণকে প্রভাবিত করেছে তা বুঝতে সাহায্য করবে এবং যারা আপনার শিশুর ব্যাবস্থাপনা দেখভাল করেন, তাদের জন্যেও এটি অনেক উপকারে আসবে।

৪. সংবেদনশীল উপায়ে প্রশমিত করুন
শিশুদের অনেক সংবেদনশীল ইস্যু আছে। যেমন, সে হয়ত নিজের হাত কামড়ায়। আবার এমনও হতে পারে  পারিপার্শ্বিক পরিবেশে বেশি খুশি হলে সে হিস্টিরিয়াগ্রস্থদের মত টানা ৭/৮ ঘন্টা হাসতেই থাকে। এটা অবশ্য কামড় দেয়ার চেয়ে ভাল। কিন্তু এটাও অবিশ্বাস্যরকমের অসুবিধা সৃষ্টি করে – ভেবে দেখুন আপনার সন্তান টানা ৮ ঘন্টা হাসতেছে এবং আপনাকে তা দেখতে হচ্ছে!
এধরণের ক্ষেত্রে আপনি প্রফেশনাল থেরাপিস্টের পরামর্শ অনুসারে কিছু কৌশল ব্যাবহার করতে পারেন তাকে শান্ত করার জন্য। যেমন, সংবেদনশীল ব্রাশ (sensory brushing), জোরে চাপ দিয়ে ম্যাসাজ (deep pressure massage), joint compressions, vibrations অথবা weighted vest or blanket ব্যাবহার করতে পারেন। শিশুর দুরবস্থার সময় এই কৌশলগুলো আপনাকে আসলেই উপকৃত করবে।

৫. যোগাযোগ অর্থাৎ কমুনিকেশন বাড়ান
যদি শিশু আচরণগত কারণে প্রতিক্রিয়া দেখায় বা ব্যাথা পেলে প্রতিক্রিয়া দেখায় তাহলে খেয়াল করবেন যে তার ইনজুরিগুলি হয় হতাশা থেকে – নিজের মত কিছু না হলে, কোনকিছু বুঝিয়ে বলতে না পারলে এবং যখন সে জানেনা কিভাবে চারপাশে উদ্ভুত পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়। শিশুর সাথে আপনার কমিউনিকেশন বাড়ান। তার সাথে প্রচুর কথা বলুন। তাকে তার মানসিক পরিস্থিতি প্রকাশের জন্য সংলাপ বা কথোপকথন যে একটা মাধ্যম হতে পারে, সে ব্যাপারে ধীরে ধীরে তাকে বোঝান। পাশাপাশি আপনি একজন অক্যুপেশনাল থেরাপিস্ট, একজন বিহেভিয়রিস্ট এবং একজন স্পিচ থেরাপিস্টের সমন্বয়ে আপনার শিশুর ম্যানেজমেন্টের জন্য একটি ভাল প্ল্যান দাঁড় করান। সেই অনুসারে কাজ করে আপনি আপনার সমস্যাটির জন্য একটি ভাল মডেল দাঁড় করিয়ে নিতেও পারবেন।

এককভাবে এ সমস্যাটির জন্য নির্দিস্ট কোন মডেল তৈরী করা সম্ভব হবে না। আপনার শিশুর আচরণ এবং সংবেদনশীলতা, তার পাশাপাশি যে পরিবেশে সে থাকছে; তারও একটি বড় প্রভাব থাকে তার এ ধরণের সেলফ ইনজুরির প্রবণতায়। প্রতিটি শিশু আচরণের ভিত্তিতে ভিন্নভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়। সেক্ষেত্রে আপনি নিজে আপনার শিশুর আচরণ ভালভাবে পর্যবেক্ষণ করে, উপরে বর্ণিত পদ্ধতিগুলোর প্রেক্ষিতে নিজে একটি কার্যকরি মডেল দাঁড় করালে এক্ষেত্রে উপকার পেতে পারেন।